HomeTop1দাম্পত্যে আবেগের দূরত্ব বাড়ছে? যে অভ্যাস বদলানো জরুরি

দাম্পত্যে আবেগের দূরত্ব বাড়ছে? যে অভ্যাস বদলানো জরুরি

লাইফস্টাইল ডেস্ক: বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে সবকিছুই ঠিকঠাক। সংসারে বড় কোনো ঝামেলা কিংবা আর্থিক টানাপোড়েন নেই।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুইজনের হাসিমুখের ফটো, একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া, ছুটির দিনে ঘুরতে যাওয়াও হয় নিয়মিত। তবু দিনের শেষে সঙ্গীর পাশে বসেও মনে হয়, কোথায় যেন একটা শূন্যতা রয়ে গেছে।
মনের কথা বলার মানুষটি পাশে থাকলেও অনুভূতি যেন তার কাছে পৌঁছায় না।
দাম্পত্য জীবনে এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই হতে পারে।

সম্পর্ক টিকে আছে, দৈনন্দিন দায়িত্বও পালন করা হচ্ছে, অথচ মানসিক ঘনিষ্ঠতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। মনোবিজ্ঞানের আলোচনায় এ ধরনের অবস্থাকে বলা হয় ‘ইমোশনাল ডিসকানেকশন’ বা আবেগগত বিচ্ছিন্নতা।
অর্থাৎ দুটি মানুষ একই সম্পর্কে থাকলেও তাদের মধ্যে অনুভূতির আদান-প্রদান ও মানসিক সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়া।
ঝগড়া না থাকলেই কি সম্পর্ক ভালো?

সাধারণভাবে মনে করা হয়, যে সংসারে ঝগড়াঝাঁটি কম, সেই সংসারেই সুখ বেশি। কিন্তু সম্পর্কের সুস্থতা কেবল বিরোধের অনুপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। সঙ্গীর কাছে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারা, মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং একে অন্যের প্রতি আগ্রহও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কখনো কখনো দম্পতিরা অশান্তি এড়াতে গিয়ে নিজেদের কষ্ট, অভিমান কিংবা অপূর্ণ চাহিদার কথা চেপে রাখেন। বাইরে থেকে এতে সম্পর্ক শান্ত মনে হলেও, দীর্ঘদিন মনের কথা অপ্রকাশিত থাকলে দূরত্ব তৈরি হতে পারে। ফলে একই ছাদের নিচে থেকেও দু’জনের জীবন যেন আলাদা পথে চলতে থাকে।

যে ছোট পরিবর্তন দূরত্ব বাড়ায়

দাম্পত্যে আবেগগত দূরত্ব সাধারণত এক দিনে হয়নি। প্রতিদিনের ব্যস্ততা, দায়িত্ব আর অভ্যাসের মধ্যেই ধীরে ধীরে এর শুরু হতে পারে।

কথা হয়, কিন্তু মন থেকে নয়

দিনভর অনেক কথাই হয়, কী রান্না হবে, বাজার থেকে কী আনতে হবে, সন্তানের পড়াশোনা কেমন চলছে কিংবা অফিসের কাজ কতটা বাকি। কিন্তু নিজের ভয়, আনন্দ, দুশ্চিন্তা, স্বপ্ন কিংবা ব্যক্তিগত অনুভূতি নিয়ে কথা বলার সুযোগ কমে যায়। একসময় কথোপকথন চলতে থাকে, অথচ মানসিক সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়ে।

শোনা হয়, বোঝা হয় না

সঙ্গী হয়তো মন খুলে কিছু বলছেন, কিন্তু অন্যজনের মনোযোগ থাকছে স্মার্টফোনের পর্দায়, কাজের চিন্তায় কিংবা নিজের উত্তর তৈরি করার দিকে। কথাগুলো কানে এলেও তার পেছনের আবেগটি বোঝা হয় না। বারবার এমন অভিজ্ঞতা হলে একজনের মনে হতে পারে, তার অনুভূতির গুরুত্ব সঙ্গীর কাছে কম।

অভিমান জমে, আলোচনা হয় না

মতবিরোধ হলেই ঝগড়া হবে, এমন ভয় থেকে অনেকে প্রয়োজনীয় কথাও এড়িয়ে যান। কিন্তু সমস্যার সমাধান না করে চুপ করে থাকলে অভিমান মুছে যায় না, বরং জমতে থাকে। ছোটখাটো অসন্তোষ একসময় বড় মানসিক দূরত্বের কারণ হতে পারে।

সম্পর্ককে ধরে নেওয়া হয় স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে

বিয়ের শুরুর দিকে একে অন্যের পছন্দ-অপছন্দ জানতে চাওয়া, দিনের গল্প শোনা কিংবা ছোট ছোট যত্ন নেওয়ার প্রবণতা থাকে। সময়ের সঙ্গে কাজ ও সংসারের দায়িত্ব বাড়লে সেই উদ্যোগ কমে যেতে পারে। সঙ্গী তো পাশেই আছেন, এই ধারণা থেকে তার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ ও যত্ন নেওয়াও কমে যায়।

দাম্পত্যে মানসিক ঘনিষ্ঠতা ফেরাতে যা করতে পারেন

সম্পর্কের দূরত্ব কমানোর জন্য সব সময় বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। বরং প্রতিদিনের ছোট কিছু অভ্যাস দু’জনের মধ্যে যোগাযোগ ও বোঝাপড়া বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

প্রতিদিন রাখুন দুজনের নিজস্ব সময়

দিনের অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট মোবাইল, টেলিভিশন ও অন্যান্য কাজ থেকে দূরে থেকে একসঙ্গে সময় কাটানোর চেষ্টা করুন। এ সময় সংসারের কাজের তালিকা নয়, বরং দিনটি কেমন গেল, কী ভালো লাগলো কিংবা কোন বিষয়টি মন খারাপ করলো, এসব নিয়ে কথা বলুন।

উত্তর দেওয়ার আগে মন দিয়ে শুনুন

সঙ্গী কোনো সমস্যা বা কষ্টের কথা বললে সঙ্গে সঙ্গে উপদেশ দেওয়া কিংবা সমাধান বাতলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রথমে তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। প্রয়োজনে জিজ্ঞাসা করুন, তিনি কি শুধু নিজের কথা ভাগ করে নিতে চাইছেন, নাকি কোনো সমাধান খুঁজতে আপনার সাহায্য চান। এতে দুজনের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়তে পারে।

ছোট ছোট যত্নের মূল্য দিন

সঙ্গীর কোনো কাজের প্রশংসা করা, সাহায্যের জন্য ধন্যবাদ জানানো কিংবা তার পছন্দের কোনো বিষয় মনে রাখা, এসব সাধারণ আচরণও সম্পর্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ভালোবাসা শুধু বিশেষ দিনে প্রকাশ করার বিষয় নয়, দৈনন্দিন আচরণেও তার প্রকাশ থাকা প্রয়োজন।

নিজের অনুভূতি স্পষ্ট করে বলুন

কোনো বিষয়ে কষ্ট পেলে নীরব হয়ে থাকা বা অভিযোগের সুরে কথা বলার বদলে নিজের অনুভূতি ব্যাখ্যা করুন। যেমন, ‘তুমি কখনো আমার কথা শোনো না’ বলার পরিবর্তে বলা যেতে পারে, ‘আমি যখন দিনের ঘটনা তোমাকে বলতে চাই, তখন তুমি মনোযোগ দিলে আমার ভালো লাগে।’ এতে দোষারোপের বদলে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়।

সঙ্গীকে নতুন করে জানার চেষ্টা করুন

সময় ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মানুষের পছন্দ, চিন্তা ও অগ্রাধিকার বদলাতে পারে। তাই দীর্ঘদিনের সম্পর্ক হলেও সঙ্গীর নতুন আগ্রহ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কিংবা বর্তমান দুশ্চিন্তা নিয়ে জানতে চান। একে অন্যকে বোঝার এই আগ্রহ সম্পর্ককে প্রাণবন্ত রাখতে সাহায্য করে।

প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের কাছে যান

বারবার আলোচনা করেও যদি দূরত্ব কমানো না যায় কিংবা প্রতিটি কথোপকথন নীরবতা, অভিমান বা বিরোধে গিয়ে শেষ হয়, তাহলে দম্পতি কাউন্সেলিংয়ের কথা ভাবতে পারেন। প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর বা থেরাপিস্ট দুজনকে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে, সমস্যার ধরন বুঝতে এবং যোগাযোগের কার্যকর পদ্ধতি শিখতে সহায়তা করতে পারেন।

সম্পর্কের শান্তির পাশাপাশি প্রয়োজন সংযোগও

দাম্পত্যে প্রতিদিন ঝগড়া হওয়া যেমন সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ নয়, তেমনি কোনো বিষয়ে কথা না হওয়াও সব সময় সুখের প্রমাণ নয়। একটি সম্পর্ককে পরিপূর্ণ করে তোলে শুধু একসঙ্গে থাকা নয়, বরং একে অন্যের কাছে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারা এবং সেই অনুভূতির যথাযথ গুরুত্ব পাওয়া।

সঙ্গীর পাশে থেকেও একাকিত্ব অনুভব করলে বিষয়টিকে অবহেলা না করে বোঝার চেষ্টা করা জরুরি, কোথায় যোগাযোগের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, কোন অনুভূতিগুলো বলা হয়নি কিংবা কোন প্রয়োজনগুলো উপেক্ষিত থেকে গেছে। খোলামেলা আলোচনা, মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং নিয়মিত যত্নের মাধ্যমে সেই দূরত্ব কমানোর পথ তৈরি হতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments