একই ছাদের নিচে, একই ঘরে পাশাপাশি বসে আছেন দুইজন। অথচ দু’জনের মন যেন দুই ভুবনে।
একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত, অন্যজন একের পর এক মেসেজের উত্তর দিচ্ছেন। মাঝখানে নেই তেমন কোনো কথা।
কখনও দুজনের চোখাচোখিও হচ্ছে না। প্রযুক্তির এই যুগে এমন দৃশ্য এখন আর অচেনা নয়।
স্মার্টফোন আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করেছে। দূরে থাকা মানুষকে মুহূর্তেই কাছে এনে দিয়েছে, কাজ ও যোগাযোগের গতি বাড়িয়েছে।
কিন্তু প্রয়োজনের এই যন্ত্রটি কখনও কখনও সবচেয়ে কাছের মানুষটির সঙ্গেও অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি করছে। বিষয়টি ঘটে খুব ধীরে, এতটাই নীরবে যে সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব বুঝতে অনেক সময় দেরি হয়ে যায়।
কথা বলার সময় কমে যাচ্ছে
সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে দুজন যখন বাড়ি ফেরেন, তখন একে অপরের সঙ্গে দিনের গল্প করার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু সেই সময়টাতেই যদি ফোন হাতে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকে পড়া হয়, তাহলে কথোপকথনের জায়গা সংকুচিত হতে থাকে।
দিন কেমন গেলো, কী ঘটলো, কী ভালো লাগলো কিংবা কী নিয়ে মন খারাপ, এমন ছোট ছোট কথাই সম্পর্ককে জীবন্ত রাখে। প্রতিদিনের এসব আলাপ কমে গেলে ধীরে ধীরে দু’জনের মধ্যে মানসিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
ফোনে মনোযোগ, সঙ্গীর মনে অবহেলা
সঙ্গী হয়তো গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা বলছেন। নিজের দিনের অভিজ্ঞতা জানাচ্ছেন কিংবা কোনো সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে চাইছেন। কিন্তু কথা শোনার মাঝেই বারবার যদি চোখ চলে যায় ফোনের পর্দায়, তাহলে সামনে থাকা মানুষটির মনে অন্যরকম অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
আপনি হয়তো মনে করছেন, কথা তো শুনছেন। কিন্তু সঙ্গীর মনে হতে পারে, তার চেয়ে ফোনটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একবার-দুবার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও নিয়মিত এমন আচরণ থেকে অভিমান, বিরক্তি কিংবা একাকিত্বের অনুভূতি জন্ম নিতে পারে। এখানে মূল সমস্যা আসলে ফোন নয়, সমস্যা হলো সঙ্গীকে যথেষ্ট মনোযোগ না দেওয়া।
নীরবতাও আর উপভোগ করা হয় না
সব সময় দু’জনের মধ্যে কথা চলতেই হবে, এমন নয়। অনেক সময় পাশাপাশি বসে নীরব থাকাও সম্পর্কের সুন্দর একটি অংশ। একসঙ্গে জানালার বাইরে তাকানো, নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত থাকা কিংবা কোনো কথা না বলেও কাছাকাছি থাকার মধ্যে আলাদা এক ধরনের স্বস্তি আছে। কিন্তু কথা থামলেই যদি দুজনের হাত ফোনের দিকে চলে যায়, তাহলে সেই নীরবতার সৌন্দর্যও হারিয়ে যায়। প্রত্যেকে নিজের আলাদা ডিজিটাল জগতে ঢুকে পড়েন। ফলে একই জায়গায় থেকেও মানসিকভাবে দু’জন আরও দূরে সরে যেতে পারেন।
ফোন নিয়ে শুরু হয় অশান্তি
সম্পর্কে ফোনের ব্যবহার নিয়ে ছোটখাটো অভিযোগ অনেক সময় বড় ধরনের মনোমালিন্যের কারণ হতে পারে।
‘সব সময় ফোন নিয়েই থাকো’, ‘আমার সঙ্গে কথা বলার সময়ও ফোন রাখতে পারো না’, এমন অভিযোগ যদি বারবার শোনা যায়, তাহলে বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ, এর আড়ালে থাকতে পারে আরও গভীর কোনো অভিমান।
সঙ্গী হয়তো মনে করছেন, তিনি আপনার কাছে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পাচ্ছেন না। ফলে ফোনকে ঘিরে তৈরি হওয়া ঝগড়ার আসল কারণ অনেক সময় ফোন নয়, বরং অবহেলার অনুভূতি।
অপরিচিত মানুষের জীবন বেশি জানা, কাছের মানুষটির কম
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকলেই অন্য মানুষের জীবনের নানা খবর চোখের সামনে আসে। কে কোথায় ঘুরতে গেলেন, কোন তারকা কী পোস্ট করলেন, কোনো পরিচিত ব্যক্তি কী করছেন, এসব তথ্য খুব সহজেই জানা যায়। কিন্তু এই ভার্চ্যুয়াল জগতের ব্যস্ততায় নিজের সঙ্গীর জীবনটাই যদি অজানা হয়ে যায়, তখন প্রশ্ন ওঠে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে। সঙ্গী কী নিয়ে ভাবছেন, সাম্প্রতিক সময়ে কী তাকে আনন্দ দিয়েছে, কোন বিষয়টি তাকে চিন্তায় ফেলেছে কিংবা কোন স্বপ্ন নিয়ে তিনি এগোচ্ছেন, এসব জানার সময় যদি না থাকে, তাহলে সম্পর্কের ভেতরের যোগাযোগ দুর্বল হতে পারে।
তাহলে কি ফোন ছেড়ে দিতে হবে?
অবশ্যই নয়। বর্তমান জীবনে ফোন কাজ, যোগাযোগ ও বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই সম্পর্ক ভালো রাখার জন্য প্রযুক্তি পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
বরং প্রয়োজন ফোন ব্যবহারে সচেতনতা। সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলার সময় ফোনটি কিছুক্ষণের জন্য পাশে রাখা, একসঙ্গে থাকার সময় পরস্পরকে মনোযোগ দেওয়া এবং অকারণে প্রতিটি নীরব মুহূর্ত স্ক্রল করে না ভরানো, এই ছোট অভ্যাসগুলোই সম্পর্কের উষ্ণতা ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।কারণ একই ঘরে থাকা আর সত্যিকার অর্থে একসঙ্গে থাকা, দুটো এক বিষয় নয়। ফোনের পর্দার ওপারে যতই বড় দুনিয়া থাকুক, সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখতে মাঝেমধ্যে সেই পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে পাশে থাকা মানুষটির দিকেও তাকানো জরুরি।

