যশোর প্রতিনিধি: দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে—জাতীয় সংসদে এমন অভিযোগ তুলেছেন যশোর-১ (শার্শা) আসনের সংসদ সদস্য সাবিরা সুলতানা মুন্নি। এসব অনিয়ম বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তিনি।
জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে দেওয়া বক্তব্যে সাবিরা সুলতানা মুন্নি বলেন, ভারত-বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে পরিচালিত হয়। সরকারের রাজস্ব আদায়ের অন্যতম প্রধান উৎস এই বন্দর হলেও দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেটের প্রভাবে রাজস্ব আদায় ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমসের সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৬ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব ঘাটতি রয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা।
সংসদ সদস্যের বক্তব্যে ডিজিটাল স্কেলে কারচুপি, উচ্চ শুল্কের পণ্য কম শুল্কে খালাস, মিথ্যা ঘোষণা এবং কমিশন বাণিজ্যের মতো অভিযোগের বিষয়ও উঠে আসে। বিভিন্ন সময়ে এসব অনিয়ম নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ এবং তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
এদিকে সংসদে অভিযোগ ওঠার পর বেনাপোল বন্দরের বিভিন্ন শেডে রাজস্ব ফাঁকি ও পণ্য খালাসে অনিয়মের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) তথ্যের ভিত্তিতে ২৯, ৪২, ১২, ৪১, ৩০ ও ১৫ নম্বর শেডসহ কয়েকটি শেডে পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে।
সম্প্রতি ২৯ নম্বর শেড থেকে শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই তিন ট্রাক পণ্য বের করে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, ওই তিন ট্রাকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের কসমেটিকস, ব্লেড, শাড়ি ও থ্রি-পিস ছিল। ট্রাকগুলোর নম্বর—যশোর-ট-১১-৩১৩৩, ঢাকা মেট্রো-ট-২০-৮৩৪৯ এবং ঢাকা মেট্রো-ট-২২-৭৪৭১।
সূত্রের দাবি, ঢাকার মৌলভীবাজারের সাদিয়া এন্টারপ্রাইজের আমদানি করা ওই পণ্যচালান খালাসের দায়িত্বে ছিল প্রত্যয় এন্টারপ্রাইজ নামের একটি সিএন্ডএফ এজেন্ট। এ ঘটনায় ২৯ নম্বর শেডের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কাস্টমসের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে।
ঘটনার পর কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেয় বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ ঘটনায় সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলামকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২৯ নম্বর শেডের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বেনাপোল বন্দরের বিভিন্ন শেডে আমদানিকারক, সিএন্ডএফ এজেন্ট এবং অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের যোগসাজশে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। মিথ্যা ঘোষণা, পণ্যের প্রকৃত মূল্য ও পরিমাণ গোপন, উচ্চ শুল্কের পণ্যের পরিবর্তে কম শুল্কের পণ্য দেখানো এবং নো-এন্ট্রির মাধ্যমে পণ্য বের করে নেওয়ার মতো অভিযোগও রয়েছে।
১২ নম্বর শেডে একটি ইমিটেশন পণ্যের চালান নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চালানটিতে ঘোষিত পরিমাণের চেয়ে অতিরিক্ত পণ্য থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও কম পরিমাণ পণ্য পরীক্ষণ দেখিয়ে খালাসের চেষ্টা করা হচ্ছে। একই ধরনের অভিযোগ ৩০ নম্বর শেডের একটি চালান নিয়েও রয়েছে।
অন্যদিকে, ৬ সেপ্টেম্বর বন্দরে আসা ইমিটেশন পণ্যের একটি চালান ৮ সেপ্টেম্বর কাগজপত্র যাচাই ও শুল্ক আদায়ের পর খালাস দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ওই চালানের সিএন্ডএফ এজেন্ট ছিল চাঁদ এন্টারপ্রাইজ।
এ ছাড়া ৪১, ২৯, ২৮, ১২, ১৫, ১৭, ৪২ ও ৩০ নম্বর শেডে বিভিন্ন সময়ে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ ওঠার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর নজরদারি ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট মহল।
অভিযোগ রয়েছে, বেনাপোল কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী, আমদানিকারক এবং সিএন্ডএফ এজেন্টের একটি অংশের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেটের কারণে রাজস্ব আদায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন।
জাতীয় সংসদে সাবিরা সুলতানা মুন্নির বক্তব্যের পর বেনাপোল কাস্টমস হাউস, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রাজস্ব ফাঁকি ও অনিয়মের অভিযোগে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।

